সব

রিপোর্টারের ডায়েরি

এবার বলি নিজেদের কথা

গোলাম মর্তুজা, সিলেট ও মৌলভীবাজার থেকে ফিরে
প্রিন্ট সংস্করণ

.২৪ মার্চ শুক্রবার
দিনের শুরুটাই অন্যভাবে
খুব ভোরে সিলেটে প্রথম আলোর নিজস্ব প্রতিবেদক উজ্জ্বল মেহেদীর ফোনটা বেজে উঠল। সিলেটের দক্ষিণ সুরমা এলাকা থেকে এক কলেজশিক্ষক ফোন করেছেন। ধরার আগেই ফোনটা কেটে গেল। কাঁচা ঘুম ভাঙার বিরক্তি নিয়ে ফোন ব্যাক করলেন উজ্জ্বল। ওই কলেজশিক্ষক কিছুটা উত্তেজিত। ভীত গলায় বললেন, শিববাড়ি এলাকায় তিনি যে বাড়িতে ভাড়া থাকেন, তার উল্টো দিকের আতিয়া মহলের সামনে অনেক পুলিশ, তারা বন্দুকের নল তাক করে রেখেছে বাড়িটির দিকে। অবিশ্বাস আর সন্দেহ নিয়ে বারবার জিজ্ঞেস করলেন উজ্জ্বল, ‘হাছা নি!’ এরপর ফোন করলেন স্থানীয় থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে (ওসি)। ওসি শুধু জানালেন, জঙ্গি অভিযান চলছে। ঘুম ছুটে গেল উজ্জ্বলের। ফোন করলেন সিলেটে প্রথম আলোর আলোকচিত্রী আনিস মাহমুদকে। বললেন, ‘পুলিশ খইছে, একটা বাসার মধ্যে জঙ্গি রেইড দিছে। জলদি যাও।’ ঘুম ছুটে যায় আনিসেরও। দ্রুত তৈরি হয়ে ছোটেন ঘটনাস্থলে। এরপর দুই দিন আর বাসায় ফেরা হয়নি, মৃত্যুও ধাক্কা দিয়ে গেছে তাঁকে।

অভিযানের তাপ ঢাকাতেও
শুক্রবারের সকালটা ঢাকায় একটু ঢিলেঢালাভাবেই কাটে। এর আগের শুক্রবারই র‍্যাবের সদর দপ্তরের ব্যারাকে আত্মঘাতী বোমা হামলার ঘটনা ঘটে। আর এ শুক্রবার সকালেই খবর এল, সিলেটে জঙ্গি আস্তানা ঘিরে রেখেছে পুলিশ। নড়েচড়ে উঠে ফোন করলাম পরিচিত এক পুলিশ কর্মকর্তাকে। তিনি বললেন, অবসরপ্রাপ্ত এক রাজস্ব কর্মকর্তার বিশাল এক পাঁচতলা ভবন—‘আতিয়া মহল’। এর নিচতলা থেকে ভোরে পুলিশের দিকে গ্রেনেড ছোড়া হয়েছে। ঢাকা থেকে বাংলাদেশ পুলিশের বিশেষায়িত ইউনিট সোয়াট (স্পেশাল ওয়েপনস অ্যান্ড ট্যাকটিস) ডাকা হয়েছে, তারা এলেই অভিযান শুরু হবে। এরপর প্রথম আলো অনলাইন খুলে দেখি, সিলেটের জঙ্গি অভিযানের খবর ভাসছে।

২৪ মার্চ দুপুর–বিকেল
অভিযান দীর্ঘ হওয়ার আলামত
এর আগের জঙ্গিবিরোধী প্রায় সব অভিযানই এক দিনের মধ্যে শেষ হয়ে গিয়েছিল, তাই এবারও সবাই ধরে নিয়েছিল, বিকেলেই অভিযান শেষ করা যাবে। দুপুরের মধ্যেই প্রথম আলো অনলাইনে দেখলাম, জঙ্গিরা সোয়াট বাহিনীকে দ্রুত আসতে বলেছে। মনে একটা খটকা তৈরি হলো। দুপুরের পর অফিসে গেলাম। বিকেলে সিলেটে সোয়াট পৌঁছেছে বলে শুনলাম। মনে করলাম কিছুক্ষণের মধ্যেই হয়তো জঙ্গি নির্মূল হবে। সন্ধ্যার আগে জানলাম সোয়াট ঘটনাস্থলে পৌঁছেছে, কিন্তু অভিযান হচ্ছে না। ভবনে প্রচুর বিস্ফোরক নাকি আছে। সিলেটের অভিযানই পরদিন পত্রিকার প্রধান খবর হবে বলে জানালেন প্রধান প্রতিবেদক টিপু সুলতান। বলে গেলেন, ‘সিলেটে খোঁজ রাখেন, ঢাকায় কথা বলেন, ডিটেইল করেন।’
অভিযানের পর সিলেটের আতিয়া মহল। ছবি: আনিস মাহমুদ২৪ মার্চ সন্ধ্যা
রাতেই সিলেটের পথে
সিলেট থেকে যখন নানা খবর আসছে, তখনই সন্ধ্যার দিকে ঢাকার বিমানবন্দরের উল্টো দিকে আশকোনা পুলিশ বক্সের পাশে আত্মঘাতী হামলা চালানোর খবর এল। আশকোনায় ছুটলেন সহকর্মী সাদ্দাম হোসেন। অফিসে বসে সমন্বয় করে প্রতিবেদন লেখা চলছে। অনেক তথ্য, ‘ঢাউস স্টোরি’, তাই সময় লাগছে। এর মধ্যেই কামরুল ভাই অফিসের নির্দেশনার কথা জানালেন—রাতের বাসে সিলেট যেতে হবে।

২৫ মার্চ শনিবার
ঝুম বৃষ্টির সকাল
ভোর সাড়ে পাঁচটার দিকে বাসে করে পৌঁছালাম সিলেটের হুমায়ুন রশীদ চত্বরে। ঝুম বৃষ্টিতে চারদিক তখন অন্ধকার প্রায়, সঙ্গে বাতাস আর ঠান্ডা। ভাগ্যিস, অভ্যাসমতো রেইনকোটটা সঙ্গেই ছিল। সেটা পরে অপেক্ষা করছিলাম প্রথম আলোর সিলেট প্রতিনিধি সুমনকুমার দাশের জন্য। আধভেজা হয়ে এলেন তিনি। হুমায়ুন রশীদ চত্বর থেকে শিববাড়ি যাওয়ার জন্য অটোরিকশা ঠিক করলাম। শিববাড়ি বাজারে রাস্তার পাশেই রেললাইন। রেললাইন আর রাস্তার পাশ ঘেঁষে সাতসকালেই ঝিরিঝিরি বৃষ্টির মধ্যে উৎসুক মানুষের ভিড়। এই বাড়াবাড়ি রকমের কৌতূহল যে কয়েক ঘণ্টা পরে তাদের কারও কারও জীবনে কী ভয়াবহ পরিণতি আনতে যাচ্ছে, তা তখন সবারই অজানা।

২৫ মার্চ শনিবার
স্পট: শিববাড়ি
রাত জাগা পুলিশ, র‍্যাব, ফায়ার সার্ভিস কর্মীরা ভোরের ঠান্ডা আবহাওয়ায় যেন ক্লান্তিতে ভেঙে পড়ছিলেন। স্থানীয় সংবাদকর্মীরা জটলা বেঁধে চা-বিস্কুট খাচ্ছেন। অনেকেই রাতে ঘুমাননি। তবে আতিয়া মহল ঘিরে থাকা পুলিশ সদস্যরা সতর্ক অবস্থানে। ভবনের ভেতরে তখন ২৯টি সাধারণ পরিবার। আছে শিশু, নারী ও বৃদ্ধরাও।
সকালবেলা চা পান করতে শিববাড়ি বাজারের একটি দোকানে ঢুকতেই দেখলাম লোকটাকে। মাঝে মাঝে চোখ মুছছেন, পাশে দুটি ক্রাচ রাখা। সাংবাদিক পরিচয় পেয়ে ঢাকার ব্যবসায়ী মোহসিন হোসেন জানালেন, তাঁর মেয়ে, জামাই ও দুই নাতি আতিয়া মহলে আটকে আছে। ফোনেও পাচ্ছেন না। খুব চিন্তিত তিনি। কথা বলতে বলতেই মোহসিনের ফোনটা বেজে উঠল। দোকানের ভেতরে ঠিকমতো শুনতে পাচ্ছেন না বলে ক্রাচে ভর করে বাইরে বের হয়ে এলেন। মেয়ে ফোন করেছে, এবার কান্নায় ভেঙে পড়লেন মোহসিন। মেয়ের সঙ্গে কথা বলে জানালেন, ভেতরে পানি-বিদ্যুৎ কিছু নেই। বাচ্চারা ভয় পাচ্ছে। দোকানের বাইরে দাঁড়িয়ে মোহসিনের সঙ্গে কথা বলতে বলতেই দেখলাম, তিতাস গ্যাসের লোকজন এসে গ্যাসের সংযোগ লাইন বিচ্ছিন্ন করছেন, সাংবাদিকেরা জটলা করে তাঁর ছবি ও ভিডিও ধারণ করছেন। ততক্ষণে সকাল আটটা।

অভিযানে সেনাবাহিনীর সাঁজোয়া যান। ছবি: প্রথম আলোএল সেনাবাহিনীর ভ্যান
কাল আটটার পরই সেনাবাহিনীর কয়েকটি ভ্যান এসে থামল। পেছনে সাদা রঙের সাঁজোয়া যান। ধুপধাপ শব্দে নামলেন কয়েকজন সেনা কমান্ডো। তাঁদের কারও কারও কাঁধে ভারী অস্ত্র। ঝিরিঝিরি বৃষ্টি আবার শুরু হয়েছে। এর মধ্যেই আনিস মাহমুদ এক হাতে বড় ক্যামেরা দিয়ে ছবি তুলছেন, আবার হাতে থাকা ট্যাব দিয়ে তাৎক্ষণিকভাবে অনলাইনের জন্যও ছবি পাঠাচ্ছেন। বৃষ্টিতে পোশাক-আশাক ভিজে গেছে, কেবল ক্যামেরাটা পানি থেকে বাঁচিয়ে রাখছেন আনিস। শুক্রবার ভোরবেলা থেকেই সমানে কাজ করে যাচ্ছেন তিনি।

অভিযান চলার সময়ই বাইরে ঘটে বোমা হামলা। আতঙ্কিত আশপাশের মানুষঅপারেশন টোয়াইলাইট
আমি একটু দূরে সরে এসেছি। হঠাৎই আনিসের উত্তেজিত ফোন, ‘ভাই, আর্মি ঢুকতেছে।’ দ্রুত আবার রাস্তার পাশে এসে গণমাধ্যমকর্মীদের জটলার মধ্যে দাঁড়ালাম। এর মধ্যেই একজন সেনা কর্মকর্তা সাংবাদিকদের কাছে এসে জানালেন, অভিযানটার নাম ‘অপারেশন টোয়াইলাইট’। যা পরিচালনা করছে সেনাবাহিনীর ১৭ পদাতিক ডিভিশন।
এরপরই আরেকজন সেনা কর্মকর্তা এসে সবাইকে সরে যেতে অনুরোধ করলেন। সবাই একটু পিছিয়ে রেললাইনের ওপারে চলে গেলেন। সেনাবাহিনীর একটি সাঁজোয়া যান গলি দিয়ে ঢুকল। আমরা রাস্তার পাশে ফায়ার সার্ভিসের ট্রাকের আড়ালে দাঁড়ানো। সামনে লাইন ধরে পুলিশ, র্যাব ও সেনাবাহিনীর সদস্যরা। রেললাইনের ওপারে হাজারো উৎসুক মানুষের ভিড়। হঠাৎই বৃষ্টির মতো গুলির শব্দ। আতঙ্কে দৌড় দিল উৎসুক জনতা। তাদের আবার ফিরে আসতে অবশ্য বেশি সময় লাগেনি।

নাসিরপুরের এই বাড়িতেই চলে অপারেশন হিটব্যাকঝোড়ো বৃষ্টিতেই অভিযান
১০টার পর আকাশ অন্ধকার করে ঝোড়ো বৃষ্টি। কাকভেজা হয়ে দৌড়াদৌড়ি করছিলেন সেনা কমান্ডোরা। আশপাশের দোকান থেকে ছাতা জোগাড় করে ছোটাছুটি করতে দেখা যাচ্ছিল অনেককেই। বৃষ্টির মধ্যে পুলিশের দুই উপপরিদর্শকসহ (এসআই) একটা চায়ের দোকানে আশ্রয় নিয়েছিলাম। বৃষ্টি পুরোপুরি থামার আগেই তাঁদের ডাক পড়ল। খবরের কাগজ মাথায় দিয়ে ছুটে গেলেন। কিছুক্ষণ পরে ফিরে এসে জানালেন, বৃষ্টির মধ্যে ভবনের ভেতরের সাধারণ পরিবারগুলোকে বের করে আনার কাজ চলছে। একটু পরে দেখা গেল ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা ভারী যন্ত্রপাতি নিয়ে ভবনটির দিকে যাচ্ছেন। পরে জানা গেল, নিচতলার গ্রিল কেটে জঙ্গিদের পাশের ফ্ল্যাটের বাসিন্দাদের বের করে আনতে গিয়েছিলেন তাঁরা।

২৫ মার্চ সন্ধ্যা
বিস্ফোরণে কেঁপে উঠল চারপাশ
শনিবার দিনভরই গুলির শব্দ, মাঝেমধ্যে ভারী বিস্ফোরণের আওয়াজ শোনা যাচ্ছিল। সন্ধ্যার দিকে আতিয়া মহল থেকে ২০০ গজ দূরে একটি বাড়িতে সংবাদ সম্মেলন ডাকে সেনাবাহিনী। ওই বাড়িতেই রাখা হয়েছিল আতিয়া মহল থেকে উদ্ধার করে আনা ৭৮ জন সাধারণ মানুষকে। সেনাবাহিনীর সংবাদ সম্মেলন কাভার করতে যান উজ্জ্বল মেহেদী ও আনিস মাহমুদ। সম্মেলন যখন শেষের পথে তখনই প্রথম আলোর অনলাইন থেকে ফোন আসে উজ্জ্বল মেহেদীর ফোনে। খবর জানাতে জানাতে হাঁটছিলেন উজ্জ্বল। পাঠানপাড়া মসজিদ গলিটা তখন অন্ধকার। হঠাৎই বিস্ফোরণের শব্দে কেঁপে উঠল চারপাশ। বিস্ফোরণের ধাক্কায় মাটিতে পড়ে গেলেন উজ্জ্বল। দৌড়ে গিয়ে একটা বাড়িতে ঢুকে পড়লেন। আনিস মাহমুদ সংবাদ সম্মেলন শেষে বের হওয়ার পথেই বিস্ফোরণের শক ওয়েভের ধাক্কা খেলেন। প্রথমে ভেবেছিলেন, হয়তো আতিয়া মহল থেকে ফের কোনো বোমা ছুড়েছে জঙ্গিরা। কিন্তু খুব কাছে চিৎকার, কান্না আর রক্তাক্ত মানুষের ছোটাছুটি দেখে ভুল ভাঙতে কয়েক সেকেন্ড লাগল তাঁর। প্রথমে ভয় পান। পরে অন্যদের সঙ্গে দৌড় দেন। কয়েক কদম যাওয়ার পরেই আবার ঘুরে দাঁড়ান। এবার মানুষের স্রোতের বিপরীতেই ক্যামেরা হাতে নিয়ে দৌড় দিলেন। এগিয়ে দেখেন কয়েকজন পড়ে আছেন রক্তাক্ত, কেউ কেউ হাত নেড়ে সাহায্য চাইছেন। এর মধ্যেই কয়েকজন এসে আহত ব্যক্তিদের তোলার চেষ্টা করলেন, আনিসও হাত লাগালেন।
আনিসসহ অন্য সাংবাদিকেরা যখন ওই বোমা হামলার হতাহত ব্যক্তিদের খবর সংগ্রহ করছিলেন, তখনই পাঠানপাড়া মসজিদের গলিতে আরেকটি বিস্ফোরণ। দুই বিস্ফোরণে র‍্যাবের গোয়েন্দাপ্রধান, দুজন পুলিশ কর্মকর্তাসহ সাতজন নিহত হন। আহত হন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য, সাংবাদিকসহ উৎসুক জনতার একাংশ। বিস্ফোরণে আহত হয়ে পরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান র‍্যাবের গোয়েন্দা শাখার প্রধান লেফটেন্যান্ট কর্নেল আবুল কালাম আজাদ।

হাসপাতালের বিছানায় বোমা হামলায় আহত ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী বিপ্লব পালআরও একটি বিস্ফোরণ
সন্ধ্যাতেই ঘটে দ্বিতীয় দফা বিস্ফোরণ। এই বিস্ফোরণটির খুব কাছে ছিলেন এটিএন নিউজের প্রতিবেদক ইমরান সুমন ও ক্যামেরাপারসন আদিত্য চক্রবর্তী। সুমন বলেন, ‘দ্বিতীয় বিস্ফোরণের পর এক ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি হয়। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরাও বিভ্রান্ত হয়ে দৌড়াদৌড়ি করছিলেন। প্রচণ্ড ভয় কাজ করছিল। এর মধ্যেই আদিত্য ছুটছিলেন ছবি তুলতে। তাঁকে টেনে ধরেও থামানো যাচ্ছিল না। পরে সবার নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে গাড়িতে উঠে পড়ি, চলে আসি।’

চোখে–মুখে আতঙ্ক
কিন্তু বেঁচে থাকার আনন্দ
ঘটনাস্থল থেকে সিলেটের জিন্দাবাজারে প্রথম আলোর অফিসে ফেরার পর দেখলাম, সেখানে স্থানীয় আরও কয়েকজন সাংবাদিক। সবার চোখে-মুখে আতঙ্কের ছাপ, বেঁচে যাওয়ার আনন্দ। প্রচুর ফোন আসছে, ভালো আছি কি না তা জানতে। সবাইকে ‘ভালো আছি’ জানালাম। এর মধ্যেই তাড়া করতে লাগল ‘ডেডলাইন’, মানে সংবাদপত্রের সময়রেখা। প্রতিবেদন লিখতে হবে, পাঠাতে হবে। সারা দিনে টুকটাক যা লিখেছি, সন্ধ্যার ঘটনার পর সব তলানিতে চলে যাবে। তাই সব ভুলে লিখতে বসতে হলো। সবার মন ভালো করার চেষ্টা হিসেবে পাশের রেস্তোরাঁ থেকে খাবার আনানো হলো। সবাই মিলে একসঙ্গে খেয়ে পরে রাতে অফিস ছাড়লাম।

মৌলভীবাজারের বড়হাটের এই বাড়িটি ছিল জঙ্গি আস্তানা২৬ মার্চ রোববার
কড়া নিরাপত্তায় অভিযান
২৬ মার্চ নিরাপত্তা কড়া হলো। আতিয়া মহলের দুই কিলোমিটারের মধ্যে সাধারণ মানুষের চলাচল একেবারেই নিষিদ্ধ হলো। তাই হুমায়ুন রশীদ চত্বরের কাছে বসে বসে বিস্ফোরণ ও গুলির শব্দ শুনতে হলো। এর ফাঁকে কয়েকবার যেতে হয়েছে এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। বোমা হামলায় আহত মানুষের খোঁজ নিতে। বিনা অপরাধে এত মানুষের করুণ পরিণতি দেখে খুব খারাপ লাগছিল। স্থানীয় যাঁরা নিহত হয়েছেন, তাঁদেরও বাড়ি বাড়ি গিয়ে খবর সংগ্রহের কাজ করতে হচ্ছিল।

আতিয়া মহলের আশেপাশে
পাশাপাশি আতিয়া মহলের আশপাশের বাড়িগুলোতে ঢুকে মানুষের ভোগান্তির খবর সংগ্রহ আর আটকে পড়া বাসিন্দাদের তত্ত্ব-তালাশ চলছিল। শুক্রবার থেকেই এলাকার লোকজনের কাজকর্ম একরকম বন্ধ। গ্যাস-সংযোগ নেই, তাই বাড়িতে রান্না নেই। কাঁচাবাজারগুলো বন্ধ, আয় নেই। সব মিলিয়ে মানুষেরও ত্রাহি অবস্থা। মূল সড়কগুলো নিরাপত্তার কারণে বন্ধ। কারও দেয়াল টপকে, উঠোন দিয়ে, দুই বাড়ির ফাঁক গলে আমরা সংবাদকর্মীরা যাতায়াত করি। বেশির ভাগ মানুষই এলাকা ছেড়েছেন। আবদুস সালাম নামের এক অটোরিকশাচালকের বাসায় গিয়ে দেখা গেল মাটিতে গর্ত করে রান্নার আয়োজন চলছে। সালাম বলেন, ‘চাইর-পাঁচটা জঙ্গির জন্য লাখো মানুষের এত কষ্ট। আল্লাহও সইবে না।’ আতিয়া মহলের পেছনের দিকে পাঠানপাড়ায় প্রায় ৪০ বছরের পুরোনো হাজি এনামের বাড়ির দেয়ালে গুলির চিহ্ন দেখা গেল। শনিবার রাতে গুলি লাগার পরে এনাম তাঁর পরিবার নিয়ে এলাকা ছেড়েছেন। পাশের দিলীপ বাবুর বাড়িতে ঘরের ভেতরে থাকা অবস্থায় একজন গুলিবিদ্ধ হয়েছেন। এসব দেখে আশপাশের মানুষজনও বাড়ি ছেড়েছেন।

২৮ মার্চ মঙ্গলবার
সিলেটের অভিযান শেষ
২৮ মার্চ রাতে অভিযান শেষ হওয়ার ঘোষণা দেয় সেনাবাহিনী।
অপারেশন টোয়াইলাইট শেষ। ২৮ মার্চ রাতে সেনাবাহিনীর সংবাদ সম্মেলন কাভার করে প্রতিবেদন পাঠাতে দেরি হয়ে গেল। রাতে আর ঢাকা ফিরতে পারলাম না। বৃষ্টি-কাদায় কাপড়চোপড়ের অবস্থা খারাপ, রীতিমতো গন্ধ বের হচ্ছে। থেকে গেলাম সিলেটেই। ঢাকায় ফোন করে স্ত্রীকেও জানালাম কাল (২৯ মার্চ) সকালেই ফিরছি ঢাকা।

মৌলভীবাজারের অভিযানে সোয়াট সদস্যরা২৯ মার্চ বুধবার
নতুন গন্তব্য মৌলভীবাজার
২৯ মার্চ সকালে ঢাকা ফিরব ভেবে রাতে ঘুমালাম। ঘুম ভাঙল যে ফোনটাতে, সেটায় জানলাম একসঙ্গে দুটো জঙ্গি অভিযান শুরু হচ্ছে মৌলভীবাজারে। যেতে হবে। কী আর করা। ছুটলাম মৌলভীবাজার। প্রবল বৃষ্টি। এর মধ্যে একসঙ্গে দুটো আস্তানা ঘিরে রেখেছে পুলিশ।
মৌলভীবাজার শহর থেকে ২০ কিলোমিটার দূরের নাসিরপুর গ্রামের এক লন্ডনপ্রবাসীর বাগানবাড়ি ভাড়া নিয়ে স্ত্রী, পাঁচ মেয়ে, এক জামাইসহ বাস করছিলেন এক ব্যক্তি। ৩০ মার্চ ‘অপারেশন হিটব্যাক’ নামে এই অভিযান শেষ হওয়ার পর পুলিশ জানাল, সেখানে অভিযান শুরুর আগেই আত্মঘাতী বিস্ফোরণ ঘটিয়ে সাতজন নিহত হয়েছে। যাদের চারজনই শিশু। এই শিশুদের সবচেয়ে ছোটটি কয়েক মাসের আর বড়টির বয়স ১১ বছরের মতো। প্রতিবেদন লিখলাম। হোটেলের ঘরে ফিরে বারবারই সেই শিশুদের কথা মনে আসছিল। চারজন শিশুর মৃতদেহ যেন মাথার ভেতরটা কুরে কুরে খাচ্ছিল। সেদিন রাতেই জানা গেল, চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছেন র‍্যাবের গোয়েন্দাপ্রধান লেফটেন্যান্ট কর্নেল আজাদ। মনটা ভেঙে যাচ্ছিল। ঢাকা থেকে যাওয়া সহকর্মী জামিল আহমেদ, নুরুজ্জামান সবারই একই অবস্থা। রাতে পুলিশের কয়েকজন কর্মকর্তার সঙ্গে আলাপ হলো। তাঁদেরও মন খারাপ। আর কী করা, সামনে এগিয়ে যেতে হবে।
৩১ মার্চ সকালে মৌলভীবাজার শহরের বড়হাটে অভিযান শুরু হলো। আবার দিনভর গোলাগুলি, বিস্ফোরণ। পরদিন ১ এপ্রিল দুপুরের মধ্যেই ‘অপারেশন ম্যাক্সিমাস’ নামের এই অভিযান শেষ হলো। এখানেও তিনজন নিহত। রাতের বেলায় প্রতিবেদন লেখা শেষ করলাম। অফিসে পাঠালাম।

এখনো তাড়িয়ে বেড়ায়
হয়তো এবারের মতো শেষ। গুলি, বিস্ফোরক, ছিন্নভিন্ন লাশ, চারটি শিশু, আজাদ ভাই—এ শব্দগুলো এখনো তাড়িয়ে নিয়ে বেড়াচ্ছে। সঙ্গে যুক্ত হয়েছে এক নতুন উদ্বেগ, যার নাম আত্মঘাতী হামলা। তবু ঢাকায় ফেরার পর দেখলাম কেউ কেউ প্রশ্ন তুলছেন অভিযান আর জঙ্গিদের অস্তিত্ব নিয়ে। এসব শুনে মন খারাপ ভাবটা গোপন করেই, নিজেদের চোখে দেখা ঘটনাগুলো আবার তাঁদের শোনাই। রাত পেরিয়ে যাচ্ছে, আছি নতুন সূর্য ওঠার অপেক্ষায়।

সাইকেল চালিয়ে পত্রিকা বিক্রি করেন চম্পা

সাইকেল চালিয়ে পত্রিকা বিক্রি করেন চম্পা

নাজমুল হকের হাজার দোয়াত

নাজমুল হকের হাজার দোয়াত

জীবনের লড়াই জিতে বিসিএস ক্যাডার

জীবনের লড়াই জিতে বিসিএস ক্যাডার

দুর্বার তারুণ্য

দুর্বার তারুণ্য

মন্তব্য ( ১ )

আপনার পরিচয় গোপন রাখতে
আমি নীতিমালা মেনে মন্তব্য করছি।
Show
1 2 3 4
 
আরও মন্তব্য

ইহাতে মন্তব্য প্রদান বন্ধ রয়েছে

সুরেলা ইমরান

সংগীত সুরেলা ইমরান

সাম্প্রতিক সময়ের একটা বিষয় নিয়ে আমি কিছুটা বিরক্ত। কিছুটা না, অনেকটাই। এখন...
২৯ এপ্রিল ২০১৭
ঊর্ধ্বপানে পিয়া

মডেলিং ঊর্ধ্বপানে পিয়া

পিয়াকে আমি চিনি দীর্ঘদিন। সেই মডেলিং ক্যারিয়ারের শুরু থেকেই। ভীষণ...
২৯ এপ্রিল ২০১৭
টানটান এক কার্টুনিস্ট

কার্টুন টানটান এক কার্টুনিস্ট

আরাফাত একজন চিত্রশিল্পী ও কার্টুনিস্ট। এটুকু বললে আরাফাত সম্পর্কে বলা শেষ হয়...
২৯ এপ্রিল ২০১৭
মঞ্চ থেকে রাজপথে

সৈয়দ হাসান ইমাম মঞ্চ থেকে রাজপথে

সৈয়দ হাসান ইমাম। অভিনেতা, আবৃত্তিকার, স্বৈরাচার ও সাম্প্রদায়িকতাবিরোধী...
২২ এপ্রিল ২০১৭
মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন    
© স্বত্ব প্রথম আলো ১৯৯৮ - ২০১৭
সম্পাদক ও প্রকাশক: মতিউর রহমান
সিএ ভবন, ১০০ কাজী নজরুল ইসলাম অ্যাভেনিউ, কারওয়ান বাজার, ঢাকা ১২১৫
ফোন: ৮১৮০০৭৮-৮১, ফ্যাক্স: ৯১৩০৪৯৬, ইমেইল: info@prothom-alo.info