সব

আমরা জেগে আছি

সজীব মিয়া
প্রিন্ট সংস্করণ

সংগঠনটির নাম ‘জেগে আছি’। এর সদস্যরা জেগে থাকেন। তরুণ প্রজন্মের এই জেগে থাকা মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য। অসচ্ছল মুক্তিযোদ্ধাদের খুঁজে বের করেন। মানুষের কাছ থেকে পাওয়া অর্থসহায়তা নিয়ে জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তানদের পাশে দাঁড়ান। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে যাত্রা শুরু করা সংগঠনটির কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন সারা দেশের কয়েক শ তরুণ। কখনো তাঁরা মুক্তিযোদ্ধার থাকার ঘর তৈরি করে দেন, কখনো ব্যবস্থা করেন স্থায়ী রোজগার কিংবা চিকিৎসার। জেগে আছি নামের এই ব্যতিক্রমী স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের নানা উদ্যোগের গল্পই থাকছে ছুটির দিনের প্রচ্ছদ প্রতিবেদনে।

ঈদের সময় অসচ্ছল মুক্তিযোদ্ধাদের অর্থসহায়তা দিয়ে থাকে ‘জেগে আছি’কুষ্টিয়ার মিরপুরের মুরাদ আলী। বয়স আর দারিদ্র্যের কাছে হারতে বসেছিলেন। মুক্তিযোদ্ধার আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি মেলেনি বলে ভাতা পান না। চার মেয়ে আর এক ছেলের বাবা মুরাদ আলী পেটের দায়ে একসময় পথে নামেন ভিক্ষার থলে হাতে। ৭০ বছর বয়সী এই মানুষের জীবনের এমন করুণ দুঃখগাথা প্রকাশিত হয় বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে। এই খবর নজরে আসে জেগে আছি সংগঠনের সদস্যদের। তাঁরা ব্যবস্থা করেন মাসিক অনুদানের। ১৪ মার্চ মুঠোফোনে কথা হচ্ছিল পক্ষাঘাতগ্রস্ত মুরাদ আলীর সঙ্গে। ধরা গলায় শুধু বললেন, ‘তারা আমার খুব উপকার করছে।’
নীলফামারীর কালিচরণ চন্দ্র রায়। মুক্তিযুদ্ধের টগবগে তরুণ। তিনি বলছিলেন, ‘সংগ্রামের সময় মুই তো ইন্ডিয়াত গেনু। ট্রেনিং করি আসি যুদ্ধ করলাম রংপুর-লালমনিরহাটত।’ কালিচরণ চন্দ্র রায়ের বয়স এখন ৬৯। মুরাদ আলীর মতো মুক্তিযোদ্ধার তালিকায় তাঁর নামও নেই। পরিবারে রয়েছেন স্ত্রী, পুত্র, পুত্রবধূ ও দুই নাতি। একমাত্র ছেলে পরিমল চন্দ্র রায় অন্যের দোকানে সাইকেল মেরামতের কাজ করেন। সেই উপার্জনেই চলে সংসার। তা দিয়ে পরিবারসহ তিনি দুই বেলা ভরপেট খেতে পারেন না। থাকার ঘরের অবস্থা আরও করুণ। কিশোরগঞ্জ-তারাগঞ্জের ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া বগুড়া খালের ঢালে একটি চাটাইয়ের ঘরেই এই পরিবারের বসবাস। সেখানে ঝড়বৃষ্টিতে যতটা না সমস্যা হয়, তারচেয়ে বেশি সমস্যা হয় শীতে। শীতের কনকনে বাতাস ঢোকে চাটাইয়ের বেড়ার ফাঁক দিয়ে।
জেগে আছি কালিচরণ রায়ের খোঁজ পেয়ে একটি সাইকেল যন্ত্রাংশের দোকান করে দেয়। তুলে দেয় থাকার ঘর। মুরাদ আলী ও কালিচরণ রায়ের মতো সারা দেশে তালিকায় নাম না থাকা সুবিধাবঞ্চিত এমন অনেকের পাশে দাঁড়িয়েছে জেগে আছি।
জেগে আছির প্রতিষ্ঠাতা ও সভাপতি মঈনুল আহসান সাবের বলেন, ‘আমাদের প্রতিনিধির মাধ্যমে তথ্য পাওয়ার পর যাচাই-বাছাইয়ের জন্য স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার, প্রতিবেশী ও পাশের গ্রামের মানুষের সঙ্গে কথা বলি। সত্যিকারের মুক্তিযোদ্ধা নিশ্চিত হতে আমরা তিন-চারটা পদ্ধতি অবলম্বন করে থাকি।’
মুক্তিযোদ্ধা নিশ্চিত হওয়ার পর তাঁর চাহিদা জানা হয়। তারপর তাঁর জন্য সংগ্রহ করা হয় অনুদান। মুক্তিযোদ্ধাদের পাশে দাঁড়াতে চাওয়া জেগে আছির শুভাকাঙ্ক্ষীদের জানিয়ে দেওয়া হয় প্রয়োজনীয় অর্থের পরিমাণ। নিয়মিত দাতা ছাড়াও অনেকে হাত বাড়ান সহায়তার।
কারও হয়তো থাকার ঘরটা ভাঙা, অর্থ নিয়েই বানিয়ে দেওয়া হয় তাঁর ঘর। আবার কারও হয়তো রোজগারের কোনো ব্যবস্থা নেই, স্থায়ী রোজগারের ব্যবস্থা করতে তাঁর জন্য করে দেওয়া হয় দোকান। চাহিদা ও তাঁদের সুবিধা অনুযায়ী কিনে দেওয়া হয় রিকশা বা গাভি। অনেক মুক্তিযোদ্ধা আবার চান মাসিক অনুদান। তাঁর জন্য সেই ব্যবস্থাও করা হয়।
এভাবেই গড়ে উঠেছে রংপুরের তারাগঞ্জ বাজারে ‘বীর মুক্তিযোদ্ধা কালিচরণ সাইকেল স্টোর’, রংপুরের উত্তর রবার্টসনগঞ্জের ‘বীর মুক্তিযোদ্ধা রেজাউল স্টোর’, গাজীপুরের ‘বীর মুক্তিযোদ্ধা ইয়াকুব আলী স্টোর’, জয়পুরহাটের বুড়োদার পরিবারের জন্য ক্ষুদ্র শিল্প কারখানা।
মঈনুল আহসান সাবের বলেন, ‘মুক্তিযোদ্ধাদের ভাতার পরিমাণ এখন সম্মানজনক পর্যায়ে। যা ভাতা পান, তা দিয়ে হয়তো তাঁর দিন চলে, কিন্তু বড় কিছু করতে যে এককালীন বরাদ্দের দরকার হয়, তা হয়তো তিনি জোটাতে পারেন না। অতালিকাভুক্ত মুক্তিযোদ্ধাদের অবস্থা তো আরও করুণ। তাঁদের জীবনে অনেক সংকট। আমরা সেই সংকটের সময় তাঁদের পাশে থাকার চেষ্টা করি।’

জেগে আছির গড়ে দেওয়া মুদি দোকানেই সচ্ছলতা ফিরেছে মুক্তিযোদ্ধা রেজাউলের। ছবি: সংগৃহীতফেসবুক থেকে মাঠে
জেগে আছির যাত্রা শুরু হয় ২০১১ সালের ডিসেম্বরে। উদ্যোগটা ছিল কথাসাহিত্যিক মঈনুল আহসান সাবেরের। শুরুর সেই দিনগুলোতে ফিরে যান তিনি, ‘পাঁচ বছর আগে আমি ফেসবুকে একটা পোস্ট দিয়েছিলাম, সেখান থেকেই আসলে উদ্যোগের শুরু।’ তাঁর পরিকল্পনার কথা জেনে চেনাজানা অনেকে আগ্রহ দেখান কাজ করার। ফেসবুকে পরিচিত ও অপরিচিত অনেকেই এগিয়ে আসেন সহায়তার জন্য। গঠন করা হয় ২৫ সদস্যের একটি কার্যনির্বাহী কমিটি। মঈনুল আহসান সাবের বলেন, ‘ধীরে ধীরে অনেকের উৎসাহে ভাটা পড়ে। তবে নূহু আবদুল্লাহ্সহ সেই কমিটির আরও পাঁচজন এখনো আছেন। মূলত সারা দেশে কাজটি নূহুর মাধ্যমে হচ্ছে।’
জেগে আছির সাংগঠনিক সম্পাদক নূহু আবদুল্লাহ্ বলেন, ‘মুক্তিযোদ্ধারা আমাদের দেশের শ্রেষ্ঠ সন্তান। তাঁদের জন্য আমরা স্বাধীন দেশ পেয়েছি। কিন্তু তাঁদের অনেকে এখনো স্বীকৃতি পাননি। অসহায়, মানবেতর, অসম্মানিত জীবন যাপন করছেন। আমরা তাঁদের খুঁজে বের করে একটু হলেও সম্মান জানাতে কাজ করছি। তাঁরা যাতে নিজেদের এই দেশের একজন গুরুত্বপূর্ণ নাগরিক হিসেবে ভাবতে পারেন, একটু ভালো খেতে পারেন, চিকিৎসা পান, অসহায় বোধ না করেন, সেটা নিশ্চিত করা আমাদের লক্ষ্য।’
নূহু বলেন, প্রতিষ্ঠার পর থেকে এ পর্যন্ত তিন শতাধিক মুক্তিযোদ্ধার পাশে দাঁড়িয়েছে জেগে আছি। নিয়মিত সহায়তার পাশাপাশি ধর্মীয় উৎসবে মুক্তিযোদ্ধাদের পাশে থাকে এই সংগঠন। ঈদ ও পূজার সময় মুক্তিযোদ্ধার দিনটা যাতে আনন্দের হয়, তাই হাতে তুলে দেওয়া হয় নগদ অর্থ।

নিজের দোকানের সামনে কালিচরণ চন্দ্র রায়জেগে থাকেন যাঁরা
ফেসবুকভিত্তিক উদ্যোগ হলেও সারা দেশে অনেকে যুক্ত আছেন এই সংগঠনের সঙ্গে। তাঁদের কেউ তরুণ সাংবাদিক, কেউ শিক্ষক, কেউ শিক্ষার্থী। নূহু আবদুল্লাহ বলেন, ‘সারা দেশে আমাদের পরিচিত মানুষের সহায়তার ফলেই কাজটি করা সম্ভব হয়।’ তাঁর এই পরিচিত মানুষের ব্যাপ্তিও নেহাত কম নয়। সারা দেশে জেগে আছির কার্যক্রমের সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে যুক্ত আছেন পাঁচ শতাধিক স্বেচ্ছাসেবী।
এই স্বেচ্ছাসেবকেরাই মূলত মাঠপর্যায়ে কাজ করে থাকেন। অসহায় মুক্তিযোদ্ধার সন্ধান দেওয়া, যাচাই-বাছাইয়ে সহায়তা করা, ঢাকা থেকে পাঠানো প্রয়োজনীয় সহায়তা মুক্তিযোদ্ধার হাতে তুলে দেওয়া এবং ঘর ও দোকান গড়ে দেওয়ার সময় তত্ত্বাবধান করা।
এমন একজন সেচ্ছাসেবক রংপুরের জীবন ঘোষ। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া এই ছাত্র রংপুর অঞ্চলের কার্যক্রমের সঙ্গে শুরু থেকে যুক্ত। তিনি বলেন, ‘দেশের জন্য, মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য কিছু করতে পারব, এই তাড়না থেকেই কাজ করছি।’

সারা দেশে মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য এই তরুণেরাই কাজ করেনএগিয়ে নেওয়ার প্রত্যয়
পাঁচ বছর পেরিয়ে গেছে। বেড়েছে পরিসর। জেগে আছির কর্মীরাও অর্জন করছেন বিচিত্র অভিজ্ঞতা। অনেক সময় অনুদানের অভাবে হয়তো থমকে গেছে কাজ। হতাশাও এসেছে মাঝেমধ্যে, কিন্তু দেশ-বিদেশের নিভৃতচারী কয়েকজন দাতার সহায়তায় আবার নেমেছেন কাজে। মঈনুল আহসান সাবের বলেন, ‘দেশ ও বিদেশ থেকে আমাদের বন্ধুদের সহায়তা না পেলে আমরা কার্যক্রম চালাতে পারতাম না।’
মুক্তিযোদ্ধাদের বয়স হয়েছে। তাঁরা কিছুদিন পর আর থাকবেন না। তাই এই উদ্যোগটা চালিয়ে নিতে চায় জেগে আছি। নিবন্ধিত সংগঠন হিসেবে বড় পরিসরে কাজ করতে চায় মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য সদা জাগ্রত জেগে আছি।

সাইকেল চালিয়ে পত্রিকা বিক্রি করেন চম্পা

সাইকেল চালিয়ে পত্রিকা বিক্রি করেন চম্পা

নাজমুল হকের হাজার দোয়াত

নাজমুল হকের হাজার দোয়াত

হ্যাকাথন কথন

হ্যাকাথন কথন

রোমাঞ্চের নেশায়

রোমাঞ্চের নেশায়

মন্তব্য ( ১ )

আপনার পরিচয় গোপন রাখতে
আমি নীতিমালা মেনে মন্তব্য করছি।
Show
1 2 3 4
 
আরও মন্তব্য

ইহাতে মন্তব্য প্রদান বন্ধ রয়েছে

দীন থেকে সুদিনে, ওঁরা আজ বিসিএস ক্যাডার

দীন থেকে সুদিনে, ওঁরা আজ বিসিএস ক্যাডার

বাবা আইসক্রিম বিক্রি করেন। দারিদ্র্যের কারণে লেখাপড়া বন্ধ হতে বসেছিল...
১৩ মে ২০১৭ মন্ত্যব্য
জীবনের লড়াই জিতে বিসিএস ক্যাডার

জীবনের লড়াই জিতে বিসিএস ক্যাডার

তাঁদের একজন ছিলেন ট্রাকচালকের সহকারী। আরেকজন বাদাম বিক্রি করতেন। অর্থকষ্টে...
১৩ মে ২০১৭ ২৬ মন্ত্যব্য
আরও কাছে বারো দেশ

এশিয়া ফাউন্ডেশন ডেভেলপমেন্ট ফেলোশিপ আরও কাছে বারো দেশ

উড়ে যাচ্ছিলাম মেকং নদীর ওপর দিয়ে, নিচেই সমৃদ্ধ মেকং বদ্বীপ। পানিসম্পদ প্রকৌশল...
০৭ মে ২০১৭ মন্ত্যব্য
বিদেশ ঘুরে আসি

বিদেশ ঘুরে আসি

তরুণদের জন্য বিশ্বের নানা প্রান্তে নিয়মিতই আয়োজিত হচ্ছে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক...
৩০ এপ্রিল ২০১৭ মন্ত্যব্য
মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন    
© স্বত্ব প্রথম আলো ১৯৯৮ - ২০১৭
সম্পাদক ও প্রকাশক: মতিউর রহমান
সিএ ভবন, ১০০ কাজী নজরুল ইসলাম অ্যাভেনিউ, কারওয়ান বাজার, ঢাকা ১২১৫
ফোন: ৮১৮০০৭৮-৮১, ফ্যাক্স: ৯১৩০৪৯৬, ইমেইল: info@prothom-alo.info