সব

ধারাবাহিক রচনা: প্রবাসের দিনরাত্রি-৩০

ইমিগ্রেশনের বিড়ম্বনা

বাপ্পী খায়ের, ওরেগন (যুক্তরাষ্ট্র) থেকে

হিথ্রো বিমানবন্দর। সংগৃহীত‘লন্ডনে এটা কি প্রথমবার আসা?’ ইমিগ্রেশন অফিসার চোখ সরু করে আমার দিকে তাকালেন। তারপর আবার তার চোখ আমার সবুজ পাসপোর্টের ওপর।

‘না।’ আমার চোখেমুখে সারা রাতের জার্নি শেষের ক্লান্তি। ইমিগ্রেশনের বিশাল লাইনে দাঁড়িয়ে ছিলাম এতক্ষণ। পা ব্যথা লাগছে। ভাবলেশহীন কণ্ঠে তারপর বললাম, ‘এর আগেও এসেছি বেশ কয়বার।’
এবার যেন অফিসার তটস্থ হলেন। পাসপোর্টের পাতা নেড়েচেড়ে আবার জিজ্ঞেস করলেন, ‘এবার কেন আসা?’
‘পরিবারের সঙ্গে দেখা করতে এসেছি।’
আমার ভাইবোন এবং পরিবারের বাকি সব সদস্য ব্রিটিশ নাগরিক। আর আমি বাংলাদেশের নাগরিক। থাকি আমেরিকায় শুনে অফিসার সাহেব কিছুটা হতচকিত হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, ‘বিষয় কি, আপনি ইউকেতে থাকেন না কেন?’
একটু রসিকতা করতে ইচ্ছে হলো, বললাম, ‘কারণ আমার আমেরিকায় থাকতেই বেশি ভালো লাগে।’
অফিসারের দৃষ্টি এবার একটু তির্যক ঠেকল। তবে আমার রসিকতাটা যেন তিনি কিছুটা ধরতে পারলেন। তার মুখে মৃদু হাসির ছায়া।
তারপর টুকটাক আরও কিছু কথাবার্তা জিজ্ঞেস করে শেষে আমাকে পাসপোর্টটি ধরিয়ে দিয়ে বললেন, ‘ওয়েলকাম টু ইংল্যান্ড অ্যান্ড এনজয় ইওর টাইম হিয়ার ইন লন্ডন।’
এবারে হিথ্রোতে ইমিগ্রেশন যেন খুব সহজে হয়ে গেল। একেবারে জামাই আদরের মতো। বছর দশেক আগে প্রথম যখন যাই, ইমিগ্রেশন অফিসারের কটমট চাহনি আর অনুসন্ধিৎসু চেহারার সামনে বেশ খানিকক্ষণ পরীক্ষা দিয়ে তবে রেহাই পেয়েছিলাম।
কিছুক্ষণ আগে মাত্র লন্ডনের হিথ্রো বিমানবন্দরে এসে পৌঁছেছি। লন্ডনে তখন সবে ভোর হয়েছে। অথচ বিশাল লম্বা ইমিগ্রেশনের লাইন। আমি যে কয়বার ইংল্যান্ড ও আমেরিকায় ইমিগ্রেশনের লাইনে দাঁড়িয়েছি, কখনোই মানুষের অভাব দেখিনি। এত এত মানুষ প্রতিদিন এই সব দেশে আসা যাওয়া করে যে, অবাক হতে হয়!
যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান প্রেসিডেন্ট যথার্থই বেশির ভাগ আমেরিকানদের বোঝাতে সক্ষম হয়েছেন যে, প্রতিদিন এতসব মানুষেরা আমাদের দেশে আসে, এরা কারা আমরা ঠিকঠাক জানি না। অতএব আমরা হয় এদের নাড়িনক্ষত্র ভালোভাবে জানব অথবা এদের আমাদের দেশে ঢুকতে দেব না! আমেরিকার ভিসা পেতে ও সে দেশে ঢুকতে এত বেশি নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং এত কড়াকড়ি অবস্থার মধ্যে দিয়ে যেতে হয় যে, এমন বক্তব্য বাচালতা ছাড়া কিছুই নয়। আর এর নামে যখন শুধুমাত্র একটি ধর্মের মানুষকে আলাদাভাবে শনাক্তকরণের আদেশ আসে, তখন সেটা ধর্মীয় বৈষম্যের পর্যায়ে পড়ে, যেটা আমেরিকার সংবিধানের পরিপন্থী।
আমি যুক্তরাষ্ট্রে আসি প্রায় দশ বছর আগে। ৯/১১-এর গন্ধ তখনো বাতাসে সতেজ। আমার স্টুডেন্ট ভিসা পেতে সিকিউরিটি ক্লিয়ারেন্সের মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছিল। এত সব ঝুট-ঝামেলার পর প্রথম যখন যুক্তরাষ্ট্রে আসি, ইমিগ্রেশনের লাইনে দাঁড়িয়ে বুক দুরুদুরু করছিল। সেই সময় শিক্ষার্থীদের ইমিগ্রেশনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা আটকে রেখে জিজ্ঞাসাবাদ করত বলে শুনতাম। বিশেষ করে মুসলমান হলে ঝক্কিটা হতো যেন বেশি। কাউকে কাউকে আলাদা ঘরে নিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা আটকে রেখে জিজ্ঞাসাবাদ করতে শুনেছি।
আমি এমনিতে খুব একটা আশাবাদী মানুষ নই। জীবনের নৌকো বাস্তবতার উথালপাতাল ঢেউয়ের সংঘর্ষে যেন ঝাঁজরা ঠেকে। বেশির ভাগ সময়ই তাই কোনো বিষয়কে সহজে নেওয়ার অভ্যাস উধাও হয়ে গেছে। কিন্তু কোনো এক অলৌকিক কারণে লন্ডন অথবা যুক্তরাষ্ট্রে ইমিগ্রেশনের সময় আমাকে খুব একটা বেগ পোহাতে হয়নি।
প্রথমবার যুক্তরাষ্ট্রের লস অ্যাঞ্জেলেসে ইমিগ্রেশনের সময় মনে হলো যেন ইমিগ্রেশন অফিসার আমার জন্য চাতক পাখির মতো অপেক্ষা করছিলেন। কোনো প্রশ্ন করা নেই, শুধুমাত্র একবার তাকালেন আমার দিকে। তার সতেজ চাহনি। তারপর গতানুগতিক নিয়মে আঙুলের ছাপ নিয়ে এবং অন্যান্য আনুষঙ্গিক কাজ সেরে আমাকে ছেড়ে দিলেন। অথচ আমি মোটামুটি মানসিক প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছিলাম আলাদা ঘরে আটক হওয়ার জন্য। সেখানে গেলে কী কী প্রশ্ন করতে পারে এবং তার উত্তরে কী বলা যেতে পারে সেসব নিয়ে মনের ভেতরে-ভেতরে বোঝাপড়া করছিলাম সারা বিমান জার্নিতে!
এবার লন্ডন থেকে ফেরার সময়ও তাই। এখন গ্রিন কার্ড আছে, ইমিগ্রেশনের আলাদা লাইন। তবু বুকের মধ্যে দুরুদুরু করে। কিন্তু আমাকে অবাক করে দিয়ে ইমিগ্রেশন অফিসার গুটিকয় প্রশ্ন করে ছেড়ে দিলেন। তার সহাস্য মুখ, চোখের চাহনি পূর্ণ দৃষ্টি। একগাল হাসি উপহার দিয়ে আমাকে বললেন, ‘ওয়েলকাম হোম’! আমেরিকা আমার হোম হয়েছে কিনা জানি না, আমিও অফিসারকে ফিরতি হাসি উপহার দিয়ে ক্লান্তি ভুলে হাঁটা দিই।
লেখকআমি গতরাতে শিকাগো থেকে রওনা দিয়ে সারা রাতের জার্নি শেষে এইমাত্র লন্ডন হিথ্রোতে এসে পৌঁছেছি। তার আগে সন্ধ্যায় ওরেগণের পোর্টল্যান্ড থেকে বিমানে চড়ে শিকাগোতে আসি। যাব লন্ডনেই মা ভাইবোনদের দেখতে।
হিথ্রোর ইমিগ্রেশন শেষে মানুষের স্রোতের সঙ্গে হাঁটছি। জার্নিতে সারা রাতের ক্লান্তি আর ইমিগ্রেশনের ঝক্কি শেষে এয়ারপোর্ট থেকে বের হয়েই মা আর ভাইবোনদের দেখে সব ক্লান্তি যেন দূর হয়ে গেল। মাকে দেখছি প্রায় বছর চারেক পর। মা সবার আগে এসে আমাকে জড়িয়ে নিলেন বুকে। মনে হয় যেন সেই ছোট্টবেলার মতো মায়ের গলা জড়িয়ে ধরে বসে থাকি সারা বেলা, আজীবন।
ইমিগ্রেশনের আমার এই সব গল্প অবশ্য সম্প্রতি পৃথিবীর হাওয়া বদলে যাওয়ার আগে, মানে যুক্তরাষ্ট্রের ২০১৬ সালের নির্বাচনের আগের। এখন কোনো অলৌকিক কারণেও মনে হয় না ইমিগ্রেশন অফিসার কাউকে, বিশেষ করে কোনো মুসলমানকে, খুব সহজে ছেড়ে দেবে। আবার যদি কখনো আমাকে যেতে হয় যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে, ফেরার সময় কী স্মিত হেসে ইমিগ্রেশন অফিসার বলবেন, ‘ওয়েলকাম হোম’! মনে হয় না, কী জানি!
লেখক বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) তড়িৎ ও ইলেকট্রনিক কৌশল বিভাগের সাবেক সহকারী অধ্যাপক। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে কর্মরত।
ধারাবাহিক এই রচনার আগের পর্ব দেখতে ক্লিক করুন:

যুক্তরাষ্ট্রে উচ্চশিক্ষা—সরল কথা-পাঁচ

যুক্তরাষ্ট্রে উচ্চশিক্ষা—সরল কথা-পাঁচ

এরাও মানুষ-তিন

এরাও মানুষ-তিন

মন্তব্য ( ৩ )

আপনার পরিচয় গোপন রাখতে
আমি নীতিমালা মেনে মন্তব্য করছি।
Show
1 2 3 4
 
আরও মন্তব্য

ইহাতে মন্তব্য প্রদান বন্ধ রয়েছে

মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন    
© স্বত্ব প্রথম আলো ১৯৯৮ - ২০১৭
সম্পাদক ও প্রকাশক: মতিউর রহমান
সিএ ভবন, ১০০ কাজী নজরুল ইসলাম অ্যাভেনিউ, কারওয়ান বাজার, ঢাকা ১২১৫
ফোন: ৮১৮০০৭৮-৮১, ফ্যাক্স: ৯১৩০৪৯৬, ইমেইল: info@prothom-alo.info