সব

স্বাধীনতা ও মুক্তিসংগ্রামের সঙ্গে অচ্ছেদ্য হাসান হাফিজুর রহমান। আগামীকাল এই কবির মৃত্যুদিন

হাসান হাফিজুর রহমানের স্বদেশযাত্রা

মিনার মনসুর
প্রিন্ট সংস্করণ

হাসান হাফিজুর রহমান (২৪ জুলাই ১৯৩২-১ এপ্রিল ১৯৮৩), ছবি: নাসির আলী মামুন, ফটোজিয়ামশুধু কবি হিসেবে নয়, একজন সক্রিয় কর্মী হিসেবেও হাসান হাফিজুর রহমান (১৯৩২-৮৩) সামগ্রিক সত্তায় মিশে আছেন আমাদের মুক্তি ও স্বাধীনতার সংগ্রামের সঙ্গে। সাম্প্রদায়িক দাঙ্গাবিরোধী গল্প সংকলন প্রকাশের মধ্য দিয়ে তিনি তাঁর সংক্ষিপ্ত অথচ কর্মমুখর সংগ্রামী জীবনের সূচনা করেছিলেন ১৯৫০ সালে, মাত্র ১৮ বছর বয়সে। এই দীর্ঘ অভিযাত্রার সফল সমাপ্তি ঘটেছে ১৯৮৩ সালে—১৬ খণ্ডে বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধ: দলিলপত্র সম্পাদনার মধ্য দিয়ে। মাঝখানে মাইলফলকের মতোই দীপ্যমান আমাদের জাতীয় ইতিহাসের অবিস্মরণীয় দলিল একুশে ফেব্রুয়ারী সংকলন। শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত তাঁর সব কর্মকণ্ড পরিচালিত হয়েছিল এক ও অভিন্ন লক্ষ্যে। স্বদেশের রাজনৈতিক স্বাধীনতার পাশাপাশি চেয়েছিলেন শ্রেণি-বৈষম্য-কণ্টকিত বিদ্যমান সমাজ-কাঠামোর আমূল পরিবর্তন।
জন্মলগ্ন থেকেই পাকিস্তানি স্বৈরশাসকদের সব আক্রমণই পরিচালিত হয়েছে আমাদের ভাষা-সংস্কৃতির বিরুদ্ধে। এই আক্রমণকে যে প্রধানত সাংস্কৃতিকভাবেই প্রতিহত করতে হবে—সেই সত্যটি সেদিন সর্বাগ্রে যাঁরা উপলব্ধি করেছিলেন, হাসান হাফিজুর রহমান ছিলেন তাঁদের পুরোভাগে। রাষ্ট্র-প্ররোচিত সাম্প্রদায়িক সহিংসতার তাৎক্ষণিক প্রতিবাদ হিসেবে প্রকাশ করলেন দাঙ্গাবিরোধী ঐতিহাসিক গল্প-সংকলন দাঙ্গার পাঁচটি গল্প; লিখলেন দাঙ্গাবিরোধী অসামান্য একটি গল্প ‘আরো দু’টি মৃত্যু’। পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর সাম্প্রদায়িক বিভাজননীতির বিরুদ্ধে এটি ছিল প্রথম ও তাৎপর্যপূর্ণ সাংস্কৃতিক প্রতিরোধ। দূরদর্শী এই সচেতনতারই শিল্পিত প্রকাশ ঘটেছিল একুশে ফেব্রুয়ারী সংকলনে। সেই সময়ের সহযোদ্ধা সৈয়দ শামসুল হক লিখেছেন, ‘১৯৫৩ সালেই হাসান ছাড়া আর কে ভাবতে পারতেন আমাদের ভেতরে যে, একুশে ফেব্রুয়ারী আসলে তো বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের বীজ, তার বপন, তার লালন, তার পরিচর্যায় লেখকদের প্রত্যক্ষ অংশ নিতে হবে।’
তাঁর সক্রিয় রাজনৈতিক ভূমিকার সূত্রপাতও ১৯৪৮-এ। এ সময় আসেন কমিউনিষ্ট পার্টির সংস্পর্শে। আমৃত্যু তিনি এ আদর্শের পতাকা সমুন্নত রেখেছেন। মুস্তাফা নূরউল ইসলাম জানাচ্ছেন, ‘...বায়ান্নর একুশে ফেব্রুয়ারিতেই প্রথম প্রচারপত্র প্রকাশ, ১৯৫৫ সালে একুশ উদ্যাপন নিষিদ্ধ হলে তা অমান্য করে একুশে উদ্যাপন, প্রচারপত্র রচনা, ছাপানো, এমনকি বণ্টন পর্যন্ত সব দায়িত্ব তিনি তুলে নিয়েছেন নিজের ঘাড়ে। তাঁর নেতৃত্বাধীন পাকিস্তান সাহিত্য সংসদ, সওগাত এবং পাকিস্তান লেখক সংঘের পূর্বাঞ্চল শাখা ও এর মুখপত্র পরিক্রমকে তিনি প্রতিক্রিয়ার বিরুদ্ধে এক শক্তিশালী ও কার্যকর হাতিয়ারে পরিণত করেছিলেন।’
তিনি মূলত কবি। প্রাবন্ধিক, গল্পকার, সম্পাদক, সংগঠক, অধ্যাপক, সাংবাদিক, কূটনীতিক ও গবেষক হিসেবে কর্মজীবন ব্যয়িত হলেও তাঁর ব্যক্তিত্বের যথার্থ প্রকাশ ঘটেছে কবিতায়। আজকে আমরা যাকে বাংলাদেশের কবিতা বলছি, এবং যে অনন্য বৈশিষ্ট্যের জন্য এটা বলছি, তিনি নিঃসন্দেহে তার অন্যতম পথিকৃৎ। প্রধানত বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনের মধ্য দিয়ে কবিতার সঙ্গে মাটি ও মানুষের যে অন্য রকম এক একাত্মতার সূচনা হলো তার দৃষ্টান্ত হিসেবে হাসানের ‘অমর একুশে’ কবিতাটির ওপর দৃষ্টি নিবদ্ধ করা যেতে পারে। মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে রচিত যখন উদ্যত সঙ্গীন কাব্যগ্রন্থ শুধু মুক্তিযুদ্ধই নয়, হাসান হাফিজুর রহমান নিজেও পূর্ণ সত্তায় উদ্ভাসিত। মুক্তিযুদ্ধ এখানে আকস্মিক বা বিচ্ছিন্ন ঘটনা যেমন নয়, তেমনি নিছক রাজনৈতিক স্বাধীনতার মধ্যে সীমিত নয় তার তাৎপর্য। এই যুদ্ধের জয়-পরাজয় সম্পর্কেও তিনি দ্বিধাহীন। কেননা, তিনি জানেন, শাশ্বত মানবিকতার জয় এবং দানবিকতার ধ্বংস অনিবার্য। যখন উদ্যত সঙ্গীন গ্রন্থের অধিকাংশ কবিতাই এই সুগভীর প্রত্যয়ের শিখরদেশ থেকে উৎসারিত। মুক্তিযুদ্ধ তাই, তাঁর কাছে ‘এখন প্রেমের চেয়েও/ পরাক্রান্ত একটি নাম’। কারণ এই যুদ্ধ ‘হানাদার বুটের পেরেক থেকে/ মাটি মার ব্যথিত বুক খুলে নেয়া’র এবং ‘নিরন্তর পলায়ন থেকে চিরকালের ঘরে ফেরা’র। জিল্লুর রহমান সিদ্দিকী লিখেছেন, ‘একই পরিস্থিতির প্রতিক্রিয়া দুই ব্যক্তির পৃথক চেতনায় কতটা ব্যক্তিগত বৈশিষ্ট্যে রূপায়িত হতে পারে, শামসুর রাহমানের বন্দী শিবির থেকে ও হাসানের যখন উদ্যত সঙ্গীন পাশাপাশি পড়লেই তার চমৎকার প্রমাণ পাওয়া যাবে।’ তাঁর এ পর্যবেক্ষণ অযথার্থ নয়।
বহু আরাধ্য সেই স্বাধীনতা আসে, কিন্তু তাঁর আর ঘরে ফেরা হয়ে ওঠে না। স্বজনহারা, গৃহহারা, বিক্ষত বাংলার বিবেক আবারও ভাষা পায় হাসানের কণ্ঠে:
অতীত এখনো ঝলসায় হীন রক্তপাতের
কদর্য আয়নায়,
আবাহনে আবাহনে ঘরে তোলা বর্তমান
স্তম্ভিত হতবাক হয়ে যায়।
হে প্রিয় স্বাধীনতা,
কী পাপ, কোন্ ক্লেদ জড়ায়ে এনেছো
ফের তোমার ঠিকানায়?
স্বাধীনতা-পরবর্তীকালের এই নিষ্ঠুর বাস্তবতা তাঁর কবিচিত্তকে গভীরভাবে নাড়া দেয়। আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে বাস্তবের এই চরম বৈপরীত্য, আশাভঙ্গের তীব্র কশাঘাত, কিছুটা হলেও, ফাটল ধরায় তাঁর অটল আস্থা ও কবিসুলভ সংযমের প্রাচীরে। এবার আর কোনো আড়াল নয়, সরাসরিই প্রকাশ করে দেন নিজের একান্ত রাজনৈতিক আনুগত্য: ‘গণতন্ত্রে আস্থা রেখেছি চিরকাল/ভেবেছি সমাজতন্ত্রে আত্মার মুক্তি/মানবতার স্বাধিকার’। সে সঙ্গে সবকিছুকে ছাপিয়ে ওঠে সর্বব্যাপ্ত এক দীর্ঘশ্বাসও। সেই দীর্ঘশ্বাস ছড়িয়ে আছে তাঁর পরবর্তী কাব্যগ্রন্থগুলোতে। সাহিত্যের প্রায় সব মাধ্যমেই রয়েছে তাঁর প্রতিভা ও নিষ্ঠার স্বাক্ষর। বিশেষত ১৯৬৫ সালে প্রকাশিত তাঁর প্রবন্ধের বই আধুনিক কবি ও কবিতার কথা না বললেই নয়। কর্মের স্বীকৃতি হিসেবে পেয়েছেন গুরুত্বপূর্ণ বহু পুরস্কারও। কিন্তু তা তাঁর দীর্ঘশ্বাসকে আড়াল করতে পারেনি কখনোই।
বস্তুত, এক বিমুখ প্রান্তর থেকে ওডেসিউসের মতো স্বদেশযাত্রা শুরু করেছিলেন তিনি; কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে শেষপর্যন্ত তাঁকে এবং অনিবার্যভাবে তাঁর স্বদেশকেও, বরণ করতে হয়েছে সিসিফাসের নিয়তি। কারণ শুরুতেই, সেই পঞ্চাশের দশকে, তাঁর কণ্ঠে স্বদেশের উদ্দেশে ঘোষিত হয়েছিল এই অমোঘ অঙ্গীকার: ‘আমার নিয়তি তুমি, দুঃখের দারুণ মুখে/তোমাকেই রাখি বুকে, অবিরাম অনির্বাণ সুখে।’ শুরু থেকে শেষ অব্দি এক প্রবল প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে তাঁকে লড়তে হয়েছে নিরবচ্ছিন্নভাবে। কিন্তু সেই অঙ্গীকার থেকে বিচ্যুত হননি আমৃত্যু। দীর্ঘ তিন দশকের অক্লান্ত শ্রম ও নিষ্ঠার মধ্য দিয়ে নিজেকে গড়ে তুলেছিলেন একটি প্রতিষ্ঠান হিসেবে। পাশাপাশি, নিজের পরিপার্শ্বকেও গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন সৃজনশীলতার মুক্ত ও উর্বর মৃত্তিকারূপে। যেখানে ‘প্রেম অবারিত হবে বিজয়ের ধারাজলে, রৌদ্রে, জোছনায়।/শত শতাব্দীর অবগুণ্ঠিত আশা পূর্ণ’ হবে। কিন্তু পরিণাম কি চিরকালই অভিন্ন?—এ আক্ষেপ হাসান হাফিজুর রহমানের নিজেরও। তাঁর ভাষায়, ‘এসব কাজ যারা করে তারা স্বভাবতই ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকে, প্রকাশ্যে দেখা যায় অনেকেই এর প্রভাবে গড়ে উঠেছেন, ধারালো হয়ে আতপ্রকাশ করেছেন। কিন্তু সংগঠক হিসেবে দ্বিধা-দ্বন্দ্বে আড়ালে থেকেই নিঃশেষিত হয়ে গেলাম।’ [মালেকা বেগম, ‘সাক্ষৎকার’ সচিত্র সন্ধানী (ঢাকা: ২৯ আগস্ট, ১৯৮২) ]
আমৃত্যু সংগ্রামের তপস্যার মধ্য দিয়ে অভিজ্ঞতার ‘রূপ-নারানের কূলে’ উপনীত হাসান হাফিজুর রহমানের উপর্যুক্ত গূঢ় সত্যভাষণ সত্ত্বেও এ কথা নির্দ্বিধায় বলা চলে, মৃত্যুতে যে কজন মানুষ নিঃশেষিত নন, তিনি তাঁদের অন্যতম।

নজরুলের সাহিত্যিক ভাতা

নজরুলের সাহিত্যিক ভাতা

নজরুল মহাজীবন

নজরুল মহাজীবন

মন্তব্য ( ১ )

আপনার পরিচয় গোপন রাখতে
আমি নীতিমালা মেনে মন্তব্য করছি।
Show
1 2 3 4
 
আরও মন্তব্য

ইহাতে মন্তব্য প্রদান বন্ধ রয়েছে

‘বিদ্রোহী রণক্লান্ত’

আমার নজরুল-জীবনী ‘বিদ্রোহী রণক্লান্ত’

নতুন নজরুল জীবনীর খোঁজে : বর্ণিল ও বাঁধনহারা জীবন ছিল কবি কাজী নজরুল ইসলামের।...
গোলাম মুরশিদ
রাজার পাহাড়

গল্প রাজার পাহাড়

ঘুম থেকে উঠে বাইরে এসে মনটা ভরে গেল। রাতের ঝড়-বৃষ্টি সবকিছু ঝেড়ে-মুছে একেবারে...
ষড়ৈশ্বর্য মুহম্মদ
স্মৃতিসুধা ও মানবিক আখ্যান

বইপত্র স্মৃতিসুধা ও মানবিক আখ্যান

অকপট স্মৃতিচারণামূলক লেখা—বিশেষত ব্যক্তি বা ব্যক্তিত্ব সম্পর্কে—সামাজিক...
আখতার হুসেন
বিশ্বে মোটা চালের দাম বাংলাদেশেই সবচেয়ে বেশি

বিশ্বে মোটা চালের দাম বাংলাদেশেই সবচেয়ে বেশি

মোটা চালের দাম বিশ্বে এখন বাংলাদেশেই সবচেয়ে বেশি। এরপরই আছে পাকিস্তান, তাও...
ইফতেখার মাহমুদ মন্ত্যব্য
শুরু হলো পবিত্র মাহে রমজান

শুরু হলো পবিত্র মাহে রমজান

শুরু হলো পবিত্র মাহে রমজান। মুসলমানদের কাছে এই মাস অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ। গতকাল...
বিশেষ প্রতিনিধি
তামিম-ঝড়ের পরও এমন হার!

বাংলাদেশ–পাকিস্তান প্রস্তুতি ম্যাচ তামিম-ঝড়ের পরও এমন হার!

এজবাস্টনে কাল দুটো ঝড় উঠল। প্রথমটা তুললেন তামিম ইকবাল। তাতে বাংলাদেশও উঠে...
ক্রীড়া প্রতিবেদক
ভাস্কর্যটি সুপ্রিম কোর্টের বর্ধিত ভবনের সামনে পুনঃস্থাপন

ভাস্কর্যটি সুপ্রিম কোর্টের বর্ধিত ভবনের সামনে পুনঃস্থাপন

সুপ্রিম কোর্টের মূল প্রাঙ্গণ থেকে সরিয়ে নেওয়া ভাস্কর্যটি কোর্টের বর্ধিত...
নিজস্ব প্রতিবেদক মন্ত্যব্য
মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন    
© স্বত্ব প্রথম আলো ১৯৯৮ - ২০১৭
সম্পাদক ও প্রকাশক: মতিউর রহমান
সিএ ভবন, ১০০ কাজী নজরুল ইসলাম অ্যাভেনিউ, কারওয়ান বাজার, ঢাকা ১২১৫
ফোন: ৮১৮০০৭৮-৮১, ফ্যাক্স: ৯১৩০৪৯৬, ইমেইল: info@prothom-alo.info